মনির হোসেন বেনাপোল প্রতিনিধি:-
দূরের একটি গ্রাম, যশোর শহর থেকে ২৭ কিলোমিটার ঝিকরগাছা উপজেলায় দেউলিগ্রামে। এক ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে সুখের সংসার ছিলো নওশের আলী ও শিরিনা আক্তার দম্পতির।
গণঅভ্যুত্থানে ছেলে ইমতিয়াজ আহম্মেদ জাবিরকে হারিয়ে শোকে কাতর এ দম্পতি। ছেলের পুরারো জামা-কাপড় আর কাগজপত্র ঘেটে সময় কাটান তারা। কৃষক পরিবারের সন্তান জাবির সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ করছিলেন। পরিবার ও সহযোদ্ধাদের ভাষ্য, আন্দোলনে তিনি প্রথম থেকেই সক্রিয় ছিলেন।
১৮ জুলাই জাবির রামপুরা এলাকায় পুলিশের টিয়ারশেল ও রাবার বুলেটে আহত হন। কিন্তু দমে না গিয়ে পরদিন ১৯ জুলাই ফের মিছিলে নামেন। এদিন বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন। সহযোদ্ধারা তাকে নিয়ে যান মুগদা জেনারেল হসপিটালে। সেখানে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ঢামেকের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৬ জুলাই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান জাবির। জাবির পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ায় যতটুকু না কষ্ট পেয়েছে তার পরিবার; তার চেয়ে অগণিত আপসোস বয়ে বেড়াচ্ছেন বাড়ির একমাত্র ছেলের মরদেহ বাড়ির ভিতরে না নেওয়ার। পরিবারের ভাষ্য, জাবিরকে একটু ছুঁয়ে দেখতে পারেনি তার নিকট স্বজনেরা। ২৬ জুলাই জাবিরের লাশ যখন ঝিকরগাছার দেউলি গ্রামের বাড়িতে আনা হয়, তখন সেখানে এক ভীতিকর পরিবেশ বিরাজ করছিল। স্বজনরা চেয়েছিলেন সকালে জানাজা শেষে লাশ দাফন করতে। কিন্তু পতিত শেখ হাসিনা সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নির্দেশ ছিলো রাতেই দাফন করার। ফলে শেষবারের মতো জাবিরকে বাড়ির ভেতরেও নিয়ে না যাওয়ার আফসোস এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে তার পরিবার।
জাবিরের বাবা নওশের আলী বলেন, জাবিরের মরদেহ ২৭ জুলাই সকালে যখন ঢামেক থেকে বের করা হচ্ছিল, তখন সেখানে উপস্থিত পুলিশ আমাদের পরিবারটির সদস্যদের টিটকারি করছিল। বলছিল, ‘যাও, ছেলেকে ভালো করে আন্দোলন করতে বলো। এখন কবরে শুয়ে শুয়ে আন্দোলন করুক।’ শুধু তা-ই নয়, ঢাকা থেকে যশোরে গ্রামের বাড়িতে আনা পর্যন্ত মিনিটে মিনিটে ফোন করে দ্রুত দাফনের নির্দেশ দিচ্ছিলো। তাদের সোজা কথা- কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতা করা যাবে না। ঢামেক থেকে গোসল করিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাড়িতে খবর খুঁড়ে রাখতে বলো। লাশ সোজা কবরে নামাবে। এর অন্যথা হলে পরিবারের সবাই বিপদে পড়বে। তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের তো এক বছর হয়ে গেল। শহীদ হওয়ারও বছর খানিক হতো চললো। কিন্তু ছেলে হত্যার তো বিচার পেলাম না। এমনকি যারা আন্দোলন ঠেকানোর নামে মানুষ নিধনে নেমেছিলো, তাদেরকেও তো বিচারের মুখোমুখি করতে পারেনি এই সরকার। তিনি বলেন, ‘ছেলে হত্যার অভিযোগে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাসহ ৯৭ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। ‘আমার স্বপ্ন তো শেষ। এখন একটাই চাওয়া অসংখ্য মানুষ হত্যায় জড়িতদের বিচার ও শাস্তি দেখতে চাই
পরিবারের সদস্যরা জানান, জাবির পরিবার শহীদ পরিবারের মর্যাদা পেয়েছে। এখন পর্যন্ত পরিবারটি জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে পাঁচ লাখ, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দুই লাখ, বিএনপির পক্ষ থেকে এক লাখ এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২ লাখ টাকা টাকা অনুদান পেয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, নওশের আলী স্থানীয় বিএনপির সাথে রাজনীতি করেন। দুই সন্তানকে উচ্চ শিক্ষিতের স্বপ্ন দেখতেন তিনি। ছেলে ঢাকায় পড়াশোনা করার জন্য মাঠের জমি বিক্রি করে খরচ জুগিয়েছিলেন। বাড়িতে একটি মুরগির খামারও ছিল, সেটাও বন্ধ রয়েছে ছেলের লেখাপড়ার খরচ মেটানোর জন্য।
যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন জানান, জুলাই আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জাবির পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তার বাবা বিএনপি রাজনীতির সাথে যুক্ত। আমাদের নেতা অনিন্দ্য ইসলাম অমিত নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন তাদের