দেশের বিভিন্ন স্থানে গত এক সপ্তাহে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মারধর, হুমকি, সংবাদ সংগ্রহে বাধা, ক্যামেরা ও পেশাগত সরঞ্জাম ভাঙচুর এবং মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ জার্নালিস্ট প্রটেক্ট কমিটি (BJPC)।

সংগঠনটির প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী গত ২২ থেকে ২৮ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনা করে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।

BJPC বলছে, সাংবাদিকরা কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক পক্ষের প্রতিপক্ষ নন। জনগণের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করতে তারা পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন। সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি, পেশাগত কাজে বাধা কিংবা সরঞ্জাম নষ্ট করা শুধু একজন সংবাদকর্মীর ওপর আঘাত নয়; এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জনগণের জানার অধিকারের ওপরও আঘাত।

বিবৃতিতে বলা হয়, শরীয়তপুরে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সময় টেলিভিশনের সাংবাদিক বি এম ইসরাফিল হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই জেলায় পরবর্তীতে দ্য ডেইলি স্টারের জাহিদ হাসান, নিউজ২৪ ও জাগো নিউজের বিধান মজুমদার এবং দৈনিক এদিনের বরকত মোল্লা সংবাদ সংগ্রহকালে হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন। পরে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি আরও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে বলে জানিয়েছে BJPC।

পিরোজপুরে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে স্টার নিউজ ও নয়া দিগন্তের শফিকুল ইসলাম মাসুদ, চ্যানেল ওয়ানের শাফিউল মিল্লাত এবং চ্যানেল এস-এর জিয়াউল হক হামলা ও পেশাগত কাজে বাধার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন।

কুমিল্লায় সংবাদ সংগ্রহে যাওয়ার পথে যমুনা টেলিভিশনের রফিকুল ইসলাম চৌধুরী খোকন, ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের তানভীর দীপু এবং স্টার নিউজের আব্দুল্লাহ আল মারুফ হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একজন প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে বলে সংবাদে এসেছে।

এদিকে রাজধানীর উত্তরায় সংবাদ সংগ্রহের সময় গ্রীন টিভির আশিক এলাহী, সজীব প্রান্ত ও ক্যামেরাপারসন সৈয়দ মেহেদী হাসান হামলার শিকার এবং তাদের ক্যামেরা, সাউন্ড ডিভাইস ও মোবাইল ফোন ভাঙচুরের অভিযোগ করেছেন।

এছাড়া কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় সাংবাদিক হাসান ইমাম রুবেলকে উড়ো চিঠির মাধ্যমে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন বলে সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে।

অন্যদিকে সাংবাদিক শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর বিষয়টিও BJPC পর্যবেক্ষণ করছে। সংগঠনটি বলছে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া যেকোনো মামলা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, প্রমাণ ও ন্যায়বিচারের নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত। কোনো অবস্থাতেই সাংবাদিকতাকে হয়রানি বা প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

> BJPC-এর দাবি

সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রতিটি ঘটনা দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

একই সঙ্গে হামলা, হুমকি, পেশাগত কাজে বাধা এবং সাংবাদিকদের ক্যামেরা ও অন্যান্য সরঞ্জাম ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা, পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা বা পাল্টা অভিযোগ হয়রানি বা প্রতিশোধমূলক কি না, তা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

BJPC আরও বলেছে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যেকোনো মামলা আইন অনুযায়ী তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হতে হবে। সাংবাদিক পরিচয় যেমন কোনো ব্যক্তিকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখার কারণ হতে পারে না, তেমনি সাংবাদিকতাকেও হয়রানির অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

সংগঠনটি সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার, প্রশাসন, পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছে।

BJPC-এর সাধারণ সম্পাদক এম এ আর কবির বলেন, “সাংবাদিকের নিরাপত্তা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি গণতান্ত্রিক সমাজে জনগণের তথ্য জানার অধিকারের অন্যতম পূর্বশর্ত। কোনো সংবাদ নিয়ে অভিযোগ থাকলে তার প্রতিকার আইন ও প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী হতে পারে। কিন্তু সাংবাদিককে শারীরিকভাবে আক্রমণ, হুমকি প্রদান, সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেওয়া কিংবা পেশাগত সরঞ্জাম নষ্ট করার কোনো সুযোগ নেই।”

তিনি আরও বলেন, “সাংবাদিকের ওপর হামলা মানে শুধু একজন সাংবাদিকের ওপর হামলা নয়—এটি জনগণের জানার অধিকার ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর আঘাত।”

BJPC জানিয়েছে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় সংগঠনটির কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা হবে।