নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ১০ নম্বর নরোত্তমপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বকশি মিঞার পুরাতন বাড়িতে তালা ভেঙে প্রবেশ করে ঘরের মালামাল তছনছ ও ভাঙচুরের পর প্রায় ৫ ভরি স্বর্ণালংকার, নগদ আড়াই লাখ টাকা, জমি-জমার দলিলসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র চুরির অভিযোগ উঠেছে। গত ১৯ আগস্ট সন্ধ্যায় এ ঘটনা ঘটে বলে ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি।
ভুক্তভোগী হাজী মোহাম্মদ আজিম মিয়া ব্যবসা ও সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ঢাকায় ব্যবসা করেন এবং স্ত্রী ও চার মেয়েকে নিয়ে সেখানেই বসবাস করেন। তার মা জাহানারা বেগমও বিভিন্ন সময় ঢাকায় ছেলেদের বাসায় কিংবা গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করেন। পরিবারের দাবি, ঘটনার আগে প্রায় তিন মাস বাড়িটি অনেকটা ফাঁকা ছিল।
পরিবারের অভিযোগ, ১৯ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবক ভবনের পেছনের আমগাছ বেয়ে ছাদে ওঠে। পরে ছাদের দরজার তালা ভেঙে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে বিভিন্ন কক্ষের মালামাল তছনছ করে। এ সময় ফ্রিজের কম্প্রেসার, সিলিং ফ্যানসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ভাঙচুর এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
পরে বাড়ির পেছনের গেট খুলে ঘরে থাকা নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার, জমি-জমার দলিল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিয়ে জাহানারা বেগমের কক্ষে থাকা সিন্দুক ভেঙে প্রায় ৫ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ আড়াই লাখ টাকা চুরি করা হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, চোর বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় একই বাড়ির বাসিন্দা বাচ্চু মিয়ার ছেলে রাকিব তাকে দেখতে পান। পরে রাকিব জাহানারা বেগমকে ওই ব্যক্তিকে দেখেছে বলে জানান এবং লোকটি তার পরিচিত বলেও দাবি করেন।
পরিবারের ভাষ্য, রাকিব আরও জানিয়েছিলেন, ওই ব্যক্তি তার কাছে ক্ষমা চেয়ে বিষয়টি কাউকে না বলার অনুরোধ করেন। এমনকি তাকে ঘরের ভেতরে তেল মাথায় দিতে দেখেছেন বলেও রাকিব জানিয়েছিলেন। আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে ওই ব্যক্তির পরিচয় জানাবেন বলেও তিনি জানিয়েছিলেন।
তবে পরবর্তীতে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে রাকিব ওই ব্যক্তিকে চিনতে পারেননি বলে জানান। এতে তার আগের বক্তব্য ও পরবর্তী অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
এ নিয়ে রাকিবের মা রুনা বেগম ছেলের কাছে জানতে চান, আগে প্রশাসনের লোকজন এলে পরিচয় জানাবেন বললেও পরে কেন ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে পারছেন না। এ সময় মা-ছেলের মধ্যে তর্কবিতর্ক শুরু হয়।
আজিম মিয়ার দাবি, কবরের ওপর ভবন নির্মাণের বিষয় নিয়ে তিনি প্রতিবাদ ও প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর স্থানীয় পলাশ মেম্বার, জামাল উদ্দিন খোকন ও তার ছোট ভাই ইকবালের সঙ্গে তার বিরোধের সূত্রপাত হয়। এরপর তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ ছাড়া একাধিক ফেক আইডি ও স্থানীয় মোল্লা বাড়ির মৃত আব্দুল মতিনের ছেলে রাব্বিকে দিয়ে আজিম মিয়ার ছবি ব্যঙ্গ করে এলাকায় পোস্টার-ব্যানার লাগিয়ে কুরুচিকর মন্তব্যের মাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হয়েছে বলে দাবি করেন আজিম মিয়া। রাব্বিকে জিজ্ঞাসা করা হলে সে জানায় যে, পলাশ মেম্বার তাকে প্রতিটি পোষ্টার লাগানো বাবত ১৫ টাকা করে দেওয়ায় সে ছবিগুলো লাগিয়েছে।
আজিম মিয়া আরও জানান, তার চাচি রুনা বেগমের কাছেও পলাশ মেম্বারের ভাই মোহনের পক্ষ থেকে আজিম মিয়ার বিল্ডিং ভেঙ্গে ফেলবে এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। এসব বিরোধের জের ধরে চুরির ঘটনায় পলাশ মেম্বারের পরিবারের কেউ জড়িত থাকতে পারেন বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি।
এদিকে, ঘটনার পরদিন ২০ আগস্ট সকালে বাড়ির লোকজন আজিম মিয়ার ঘরের দরজা খোলা দেখতে পান। ভেতরে প্রবেশ করে বিভিন্ন কক্ষের মালামাল এলোমেলো এবং ভাঙচুরের চিহ্ন দেখতে পান তারা। পরে বিষয়টি জাহানারা বেগমকে জানানো হলে তিনি বাড়িতে এসে সিন্দুক ও আলমারি খোলা এবং স্বর্ণালংকার ও টাকা না পেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
ঘটনার পর হাজী মোহাম্মদ আজিম মিয়া বাদী হয়ে বেগমগঞ্জ মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে চুরি ও ভাঙচুরের ঘটনা তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্ত এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
অভিযোগের পর বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বেগমগঞ্জ মডেল থানার সেকেন্ড অফিসার পাপেল রায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি ঘটনাস্থল ঘুরে দেখার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন।
পাপেল রায় বলেন, “অভিযোগ পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। তদন্তের মাধ্যমে চোর শনাক্ত হলে পরবর্তীতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ঘটনার বিষয়ে একই বাড়ির এবং পাশাপাশি ঘর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন পলাশের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ঘটনার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না অথচ ওই সময় পলাশ মেম্বার বাড়িতে ছিলেন । ঘটনা ঘটলেও বিষয়টি পুলিশ তদন্ত করবে।” এ সময় তিনি সাংবাদিকের কাজ নিয়েও বিরূপ মন্তব্য করেন।
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার।