মাদরাসা শিক্ষার স্বকীয়তা ও কওমি মাদরাসার ঐতিহ্য রক্ষায় আলেম সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট ওলামায়ে কেরাম। আজ সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন হলে বাংলাদেশ মাদরাসা অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) আয়োজিত ‘ষড়যন্ত্রের কবলে মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা ও কওমি মাদরাসার ঐতিহ্য সংরক্ষণে ওলামায়ে কেরামের দায়িত্ব ও কর্তব্য’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তাঁরা এ আহ্বান জানান।

দেশের ৬৫০ এর অধিক মাদরাসার সমন্বয়ে গঠিত এ সংগঠনের সভায় মাদরাসা শিক্ষার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, ঐতিহাসিক অবদান, প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার এবং ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় আলেম ওলামা, মাদরাসা পরিচালক ও সচেতন নাগরিকদের করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।

বক্তাদের মূল কথাঃ

বক্তারা বলেন, মাদরাসা শিক্ষা এ দেশের ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর স্বকীয়তা, পাঠ্যক্রমের স্বাতন্ত্র্য ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে এমন যেকোনো উদ্যোগের বিরুদ্ধে নীতিনিষ্ঠ, যুক্তিনির্ভর ও ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে হবে। মাদরাসা শিক্ষাকে ঘিরে বিভ্রান্তি, বৈষম্য কিংবা অযৌক্তিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা দেখা দিলে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া সময়ের দাবি।

তাঁরা আরও বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়ন, যুগোপযোগী দক্ষতা অর্জন ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে সংস্কারের নামে দ্বীনি শিক্ষার মূল আদর্শ, কওমি মাদরাসার ঐতিহ্য ও আলেম সমাজের ন্যায্য অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না। এ বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট আলেম ওলামা, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদদের মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যঃ

প্রধান অতিথি শাইখুল হাদিস আল্লামা মহিউদ্দিন রব্বানী বলেন, “মাদরাসা শিক্ষা শুধু একটি শিক্ষাব্যবস্থা নয়; এটি আমাদের ঈমানি চেতনা, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও নৈতিক মূল্যবোধের ধারক। এর স্বকীয়তা রক্ষায় আলেম ওলামাকে বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মাদরাসা শিক্ষার বিরুদ্ধে যেকোনো অন্যায়, বৈষম্য ও অযৌক্তিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ, সুসংগঠিত ও দৃঢ় প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে।”

তিনি দ্বীনি শিক্ষার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইসলামী জ্ঞান ও ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান।

সভাপতির বক্তব্যঃ

সভাপতির বক্তব্যে বিএমএর সভাপতি মুফতি আব্দুল হামিদ গওহারী বলেন, “মাদরাসা শিক্ষার মর্যাদা ও কওমি ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্নে আমরা কোনো আপস করতে পারি না। তবে আমাদের প্রতিবাদ হবে যুক্তিনির্ভর, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ। বিভক্তি নয়, ঐক্যই আমাদের শক্তি। দেশের মাদরাসাগুলোর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দ্বীনি শিক্ষার স্বকীয়তা সংরক্ষণে সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।”

তিনি মাদরাসা শিক্ষার বিরুদ্ধে যেকোনো বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ পরিহার, আলেম সমাজের মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানান। পাশাপাশি দেশের সব মাদরাসার শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও ধর্মপ্রাণ জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার অনুরোধ করেন।

প্রতিষ্ঠাতা ও সাংগঠনিক সম্পাদকের বক্তব্যঃ

বিএমএর প্রতিষ্ঠাতা ও সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতী হিফজুর রহমান বলেন, “দেশের ৬৫০ এর অধিক মাদরাসাকে নিয়ে বিএমএর এই উদ্যোগ মাদরাসা শিক্ষার অধিকার ও ঐতিহ্য রক্ষার সম্মিলিত প্রয়াস। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, মাদরাসা শিক্ষাকে অবমূল্যায়ন করা, এর স্বকীয়তা সংকুচিত করা কিংবা আলেম সমাজকে উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। মাদরাসা শিক্ষার প্রশ্নে নীরবতা নয়, প্রয়োজন সচেতনতা, সংগঠন ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ।”

তিনি জানান, মাদরাসার শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পরিচালনা কমিটি ও আলেম সমাজের ন্যায্য দাবি তুলে ধরতে বিএমএ ধারাবাহিকভাবে কাজ করবে। মাদরাসা শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে যেকোনো নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপে আলেম ওলামার সঙ্গে অর্থবহ আলোচনা নিশ্চিত করতে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।

উপস্থিত ওলামায়ে কেরাম ও আলোচকবৃন্দঃ

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী, মুফতি বশিরুল্লাহ, মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মুফতি আহমদ আলী কাসেমী, মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী, শাইখুল হাদিস মুফতি সালাউদ্দিন, মাওলানা ফজলুর রহমান, মুফতি শামসুদ্দিন কাসেমী, মোহাম্মদ রাজ (নওমুসলিম), মুফতি নজিরুল ইসলাম, মুফতি রফিকুল ইসলাম নূরানী, মুফতি মাহমুদুল হক হাফেজ্জী, মুফতি ওমর ফারুক সিরাজী, মুফতি মোজাম্মেল হক, মাওলানা রঈস উদ্দিন, মুফতি আহসান হাবিব, মাওলানা মোবাশ্বের হোসেন, মাওলানা আবির মোহাম্মদ রওশন ও মাওলানা মোস্তফা কায়ছার প্রমুখ।

বিএমএর আহ্বানঃ

বাংলাদেশ মাদরাসা অ্যাসোসিয়েশন মনে করে, মাদরাসা শিক্ষার মর্যাদা ও কওমি ঐতিহ্য সংরক্ষণ কোনো একক ব্যক্তি বা সংগঠনের দায়িত্ব নয়, এটি সম্মিলিত জাতীয় দায়িত্ব। তাই মাদরাসা শিক্ষার বিরুদ্ধে যেকোনো ষড়যন্ত্র, বৈষম্য কিংবা স্বকীয়তা বিনষ্টের অপচেষ্টা প্রতিহত করতে আলেম ওলামা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখতে হবে।