মোঃ সুমন, ক্রাইম রিপোর্টারঃ মুন্সীগঞ্জ শ্রীনগর উপজেলার বাড়ৈখালী ইউনিয়ন ৩ নং ওয়ার্ড শিবরামপুরে মোঃ মোশাররফ হোসেন (৫৫) নামে এক মানসিক প্রতিবন্ধীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তারই পরিবার থেকে।মৃত্যের সৎ ভাই নজরুল ইসলাম ননী অভিযোগ করে প্রতিবেদককে জানান,মৃত মোশাররফ পিতার ২য় ঘরের সন্তান।পিতা মরহুম আঃ জলিল ব্যক্তি জীবনে ৩ টি বিবাহ করেন।মোশাররফ কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন থাকলেও সে খুবই মেধাবী ও শক্তিশালী ছিল।তিনি বড় বোনের অধীনে বসবাস করে আসছিলেন,জলিলের ১ম ঘরের সন্তান সৎ ভাই মোঃ বিল্লাল হোসেন মহব্বত (৬৫) ও তার স্ত্রী মমতাজ বেগম (৪৮), মরহুম মোশাররফকে উন্নত চিকিৎসার কথা বলে কৌশলে এক প্রকার চাপ তৈরি করে তাদের জিম্মায় নেন।
মহব্বতের দুই সন্তান মোঃ মিলন (৩৫) এবং সম্রাট (৩২) ওয়ারিশ সুত্রে পাওয়া সম্পত্তি মোশাররফকে লিখে দিতে চাপ প্রয়োগ করে বিভিন্ন ধরনের মানসিক এবং শারীরিক নির্যাতন শুরু করেন। বিষয় টি বুঝতে পেরে তার ভাই মোঃ নজরুল ইসলাম ননী তাকে তাদের নিকট ফেরত দিতে বলেন,এতে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে বিভিন্ন সময় তাকে জানে মেরে ফেলার হুমকি-ধামকি দেওয়ার পাশাপাশি উল্টো মোশারফের জমি তাদের দখলে নেওয়ার পায়তারা করতে থাকেন। মানসিক ভারসাম্যহীন মোশাররফের ওয়ারিশ অংশ লিখে নেওয়ার উদ্দেশ্য গোপনে তাকে ঢাকা নিয়ে যান মহব্বত।তার কোন সন্ধান না পেয়ে ভাগিনা শাকিল (২৫) গত ২৬/০৯/২৫ তারিখ বেলা অনুমান ০৯ঃ০০ তার খোঁজ নিতে মহব্বতের বাড়ি পৌঁছুলে সন্ধান না দিয়ে উল্টো খুন ও ঘুম করার হুমকি-ধামকি দেয় বলে জানান শাকিল।
অন্য দিকে মুক্তার নামে নজরুল ইসলামের আরেক ভাই প্রায় ২০/৩০ বছর ধরে নিখোঁজ উক্ত ভাইয়ের জমিও জাল-জালিয়াতি করে মোহাব্বতের নামে লিখে নেন বলে জানান এলাকাবাসী।এলাকাবাসী আরও জানান মৃত আব্দুল জলিলের রেখে যাওয়া সম্পদের জন্যই তাদের ভাইদের মধ্যে গুম-পরিকল্পিত হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে বলে আমরা মনে করি।
ভারসাম্যহীন মোঃ মোশাররফ হোসেনের কোন খোঁজ খবর না পাওয়ায় তার ভাই মোঃ নজরুল ইসলাম ননী বাদী হয়ে ভাই মহব্বত ও তার স্ত্রী মমতাজ বেগম এবং তাদের দুই সন্তানের বিরুদ্ধে গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ শ্রীনগর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। যেখানে তার ভাইকে নির্যাতন করা হচ্ছে মর্মে অভিযোগ করে।
এদিকে গত ১১/১২/২৫ ইং তারিখ মোশাররফ মারা গেছেন বলে এলাকাবাসী জানতে পারে, মৃত্যুর পর আত্মীয় ও আপনজনদের কাউকে না জানিয়ে গোপনে তার লাশ নবাবগঞ্জ উপজেলার আগলা ইউপির বেনুখালী কবরস্থানে দাফন করা হয়।মোশাররফের স্বজনদের দাবি, চিকিৎসার নামে সম্পদ হরনের লক্ষ্যে তাকে দীর্ঘদিন শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি ক্ষতিকারক ঔষধ সেবনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে।
মোশাররফ পরিকল্পিত হত্যার শিকার না স্বাভাবিক মৃত্যু তা জানতে,বাড়ৈখালীর শিবরামপুর মহব্বতের বাড়ি পৌছুলে প্রতিবেদকের উপস্থিতি বুঝতে পেরে মহব্বত ও তার পরিবারের লোকজন ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়। বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে বারবার ডাকা ডাকির পর প্রতিবেদকের সাথে কথা বলতে এক পর্যায়ে রাজি হলেও মোহাব্বতের ছেলে মিলন ও তার স্ত্রী প্রতিবেদকের সাথে অস্বাভাবিক আচরণ করেন।মোশারফের মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে,মহব্বতের ছেলে মিলন বলেন,আমার চাচা মোশাররফ দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিল আমরা বহুভাবে তার চিকিৎসা ও সেবা করেছি।তাকে আমরা কোথায় কোথায় নিয়ে চিকিৎসা করেছি,চিকিৎসার সকল কাগজ পত্রাদি আমাদের কাছে প্রমাণস্বরূপ এখনো রয়েছে।যিনি আপনাদের কাছে অভিযোগ করেছে তিনি আমাদের রক্তের কেহ নয়।
মোশাররফকে পরিকল্পিত হত্যা করা হয়েছে না স্বাভাবিক মৃত্যু এর উত্তরে অভিযুক্ত মহব্বত বলেন,নজরুল ইসলাম আমার ভাই না। তিনি আমার পিতার ঔরসজাত সন্তান নয়।তার গর্ভধারিনী মায়ের সাথে আমার বাবার বিবাহ বিচ্ছেদ হয় ১৯৬৫ সালে আর অভিযোগকারী নজরুল ইসলাম ননীর জন্ম হয় ১৯৭১ সালে, তাহলে সে আমার ভাই হয় কিভাবে।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে শ্রীনগর থানায় নজরুল ইসলাম ননীর দায়ের করা লিখিত অভিযোগের পুলিশি তদন্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে, তিনি বলেন এধরনের অভিযোগ হয়েছে বলে আমরা জানিনা এবং থানা পুলিশ কোনদিন আমাদের কাছে তদন্ত করতে আসেনি। নজরুল ইসলাম ননী ও তার পিতার স্বজনদের বরাবরে বাড়ৈখালী ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দাখিলকৃত ওয়ারিশিয়ান সনদের বিষয়ে মহব্বত বলেন, নজরুল ইসলাম ননী আমার ভাই নন এবং আমার স্ত্রী ও আমি মক্কা শরীফ হজ্জ্বে থাকাকালীন সময়ে স্থানীয় মেম্বার ও চেয়ারম্যান কে ভুল বুঝিয়ে মিথ্যা তথ্য ও টাকা দিয়ে এ ওয়ারিশ সনদ গ্রহণ করে।
এ বিষয়ে ইউপি সদস্য রাজিব শেখ বলেন, টাকার বিনিময় সনদ এটা মিথ্যা কথা।তাদের ভাই-বোনের মধ্যে ঝগড়া ও বিরোধ রয়েছে। তারা আগে ও পরে দফায় দফায় কয়েক টি ওয়ারিশিয়ান সনদ নিয়েছে। কিছুদিন পূর্বে নজরুল ইসলাম ননী তার পিতা মৃত আব্দুল জলিলের ওয়ারিশ সনদ চেয়ে পরিষদের বরাবর আবেদন করলে,আমি ওয়ার্ড মেম্বার হিসেবে অনেক যাচাই-বাছাই করি এবং তাদেরকে পরিষদে ডেকে এনে চেয়ারম্যানসহ প্রকাশ্যে এবং গোপনে তদন্ত ও শুনানি করে,প্রকৃত সনদ প্রদান করি।আমি মনে করি ওই ওয়ারিশ সনদে কোন প্রকার ভুল নেই।
অভিযোগকারী নজরুল ইসলাম ননী অভিযোগ করে আরো বলেন, আমার ভাই মোশাররফকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার কয়েক দিন পূর্বে শ্রীনগর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে নিয়ে গিয়ে আমার ভাইয়ের স্থাবর-অস্থাবর ওয়ারিশের সম্পত্তির অংশ সুকৌশলে মহব্বত ও তার ছেলেরা লিখে নেন,যাহা সম্পূর্ণ বেআইনি।মোশাররফের মৃত্যুর পূর্বে তাকে শ্রীনগর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মহব্বতের ছেলে মিলন নিশ্চিত করে বলে “হ্যাঁ” তাকে সাব রেজিস্ট্রার অফিসে নিয়ে গিয়েছিলাম।আপনারা সেখানে গিয়ে বের করে নেন। আমরা আপনাদেরকে এ বিষয়ে কিছু বলবো না।
শিবরামপুর গ্রামের বয়োজেষ্ঠ এক মুরুব্বী পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন,মোশারফের মৃত্যু অস্বাভাবিক বলে মনে করি আমি,কারণ মোশারফের মৃত্যুর পরে তার ভাই মহব্বত তড়িগড়ি করে কোন রকম জানাজা শেষ করে, নবাবগঞ্জ উপজেলার আগলা ইউনিয়নের বেনুখালি কবরস্থানে দাফন সম্পূর্ণ করে। যে বিষয়টি গ্রামবাসীর কাছে সন্দেহ মূলক মনে হয়।
মোশারফের মরদেহ গোসল করানো বেনুখালি গ্রামের মোবারক হোসেন (৭০) নিকট মৃত ব্যক্তির শরীরে অস্বাভাবিক কোন চিহ্ন রয়েছে কিনা জানতে চাইলে মোবারক হোসেন জানান, মোশারফের মরদেহে তেমন কোনো অস্বাভাবিক আঘাতের চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়নি। কিন্তু তার ডান পায়ে একটি আঙ্গুল কাঁটা ছিল যেখানে ব্যান্ডিজের মতন কিছু একটা পেঁচানো ছিল।মোশারফের পায়ের আঙ্গুল কাঁটা থাকার বিষয়ে মহব্বতকে জিজ্ঞেস করলে সে এই বিষয়ে কিছু না বলে এড়িয়ে যান।
এ বিষয়ে জানতে শ্রীনগর থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ জুয়েল মিঞা (ওসি) জানান, এই বিষয়ে এমন কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি, তবে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে তারপর বিস্তারিত জানানো হবে।


